ই‘তিকাফের আদব, ফযীলত ও করণীয়

ramadan-itikaf

ভূমিকা  ই‘তিকাফ – এর শাব্দিক অর্থ হলো সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্রতার সঙ্গে কোন উদ্দেশ্যে কোন স্থানে অবস্থান করা। শরী‘আতের পরিভাষায় ই’তিকাফ অর্থ রামাযানের শেষ দশকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে মসজিদে অবস্থান করা। রামাযানে ছিয়ামের যত হক নষ্ট হয়েছে, যত ক্রটি-বিচ্যুতি ও গাফলত হয়েছে তা সংশোধন করার জন্য এবং রামাযানের কল্যাণ ও বরকত পরিপূর্নরূপে হাছিল করার জন্য ই‘তিকাফ হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ইবাদত।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন- ই‘তিকাফের উদ্দেশ্য হচ্ছে, গায়রুল্লাহর সমস্ত বেরাজাল থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সঙ্গে গভীর প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপন করা। ই‘তিকাফের মাধ্যমে হৃদয় ও আত্মা এমনই পবিত্রতা লাভ করে যে, আল্লাহর যিকির ও প্রেম ছাড়া আর কিছু তখন তাতে স্থান পায় না। আল্লাহর ধ্যান ও চিন্তা ছাড়া আর কোন চিন্তার প্রতি তার উৎসাহ থাকে না। তার সমগ্র সত্তা তখন আল্লাহ তা’আলার সঙ্গ ও নৈকট্য এবং ‘কুরব ও মা’ইয়্যাত’ হাছিলের পূর্ণ উপযোগী হয়ে যায়। মাখলূকের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তে সে তখন আল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং আল্লাহর প্রতি আত্মবিলীনতা অর্জনের জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ে।

আর যারা শেষ দশকের পুরো দিন রাতগুলোতে ই‘তিকাফ করবেন তাদের লাইলাতুল কদর পাওয়াটা অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যাবে। যেহেতু তারা শবে কদর হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনাময়ী পুরো দশদিনই আল্লাহর দরবারে পড়ে থাকবেন।

ই‘তিকাফের ফযীলত

ই‘তিকাফের ফযীলত ও মর্যাদার জন্য তো এটাই যথেষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রামাযানের শেষ দশক খুব ইহতিমামের ও গুরুত্ব সঙ্গে ই‘তিকাফ করেছেন, আর ওফাতপূর্ব রামাযানে বিশদিন ই‘তিকাফ করেছেন। বোখারী, হাদীছ নং ২০৪৪

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহ আনহার বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াফাতের পর তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ ই‘তিকাফের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। বোখারী, হাদীছ নং ২০২৬ (অবশ্য স্ত্রীলোকের ই‘তিকাফ মসজিদে নয়, বরং ঘরে একটি স্থান নির্দিষ্ট করে সেখানেই তারা অবস্থান করবে।)

ই‘তিকাফের ফযীলত সম্পর্কে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

অর্থঃ যে ব্যক্তি ই‘তিকাফ করে সে তো আসলে গোনাহ থেকে দূরে থাকে। (কারণ মসজিদের পরিবেশই এমন যে, গোনাহের বিশেষ কোন অবকাশ নেই।) আর তার জন্য সমস্ত নেক আমলকারীর সমান নেকি জারি করা হয়। (ইবনে মাজাহ, হাদীছ নং ১৭৮১)

অর্থাৎ ই‘তিকাফের অবস্থান থাকার কারণে সে যেসব নেক আমল করতে পারে না যেমন রোগীর তত্ত¡তালাশ, জানাযার সঙ্গে গমন, ইত্যাদি তো তার আমলনামায়ও ঐ সমস্ত নেক আমলের ছাওয়াব লেখা হতে থাকে।

হযরত ইবনে আব্বাছ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে বর্নণা করেন যে,  যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে খাটি দিলে একদিন ই‘তিকাফ করবে, আল্লাহ তা’আয়ালা জাহান্নামকে তাঁর থেকে তিন খন্দক দূরে সরিয়ে দিবেন। এক খন্দক বলে বোঝানো হয় আসমান জমিনের যে দূরত্ব তার চেয়েও বেশি দূরত্বকে (শোআবুল ইমান)

এক দিনের ই‘তিকাফ এর দ্বারা জাহান্নাম এরকম অনেক অনেক দূরে সরে যায়। আর জাহান্নাম তার থেকে দূরে সরে যাওয়ার অর্থ সে জান্নাতের কাছে চলে আসে।

হাদিছ শরীফে আছে যে ব্যক্তি রমযান মাসের শেষ ১০ দিন ই‘তিকাফ করবে তাঁর দুটি হজ্ব এবং দুইটি উমরার সমতুল্য সওয়াব হবে। – (বায়হাকী)

যে ব্যক্তি খালেছ নিয়তে এবং ঈমানের সাথে সওয়াবের আসায় ই‘তিকাফ করবে তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। সুবহানাল্লাহ।

সুন্নাত ই‘তিকাফ এর মাসায়েল

  • রামাযানের শেষ দশক ই‘তিকাফ করা সুন্নতে মুআক্কাদায়ে কেফায়া।
  • রামাযানের ২০ তারিখ সূর্যাসেÍর পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্তু ই‘তিকাফের সময়।
  • ই‘ তিকাফে খাস কোন ইবাদত করা শর্ত নয়- যে কোন নফল নামায, যিকির-আযকার, তিলাওয়াত, দ্বীনি কিতাব পড়া, পড়ানো বা যে ইবাদত মনে চায় করতে পারে।
  • ই‘তিকাফ শুরু করার পর নিজের বা অন্যের জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনন্যোপায় অবস্থায় ই‘তিকাফের স্থান থেকে বের হলে গোনাহ নেই বরং তা জরুরী। তবে তাতে ই‘তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
  • কোন শরীআত সম্মত প্রয়োজনে বা ¯^াভাবিক প্রয়োজনে বের হলে ইত্যবসরে কোন রোগী দেখলে বা জানাযায় শরীক হলে তাতে কোন দোষ নেই।
  • পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ই‘তিকাফে বসা অথবা বসানো উভয়টা না-জায়েয ও গোনাহ।

ই‘তিকাফের শর্ত

১)   এমন মসজিদে ই‘তিকাফ হতে হবে যেখানে নামাযের জামাআত হয়। জুমুআ-র জামাআত হোক বা না হোক। এ শর্ত পুরুষের ইতিকাফের। মহিলাগণ- ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে ই‘তিকাফ করবে।

২)  ই‘তিকাফের নিয়ত করতে হবে।

৩)   হায়েয নেফায শুরু-হলে ই‘তিকাফ ছেড়ে দিবে।

যে সব কারনে ই‘তিকাফ ফাসেদ তথা নষ্ট হয়ে যায় এবং কাযা করতে হয়-

১)  ই‘তিকাফের স্থান থেকে শরীআত সম্মত প্রয়োজন বা ¯^াভাবিক প্রয়োজন ছাড়া বের হলে ই‘তিকাফ ফাসেদ হয়ে যায়। শরীআত সম্মত প্রয়োজন হলে মসজিদের বাইরে যাওয়া যায়, যেমন সে মসজিদে জুমুআর জামাআত না হলে জুমুআর নামাযের জন্য জামে মসজিদে যাওযা, ফরজ বা সুন্নাত গোসলের জন্য বের হওয়া ইত্যাদি। আর ¯^াভাবিক প্রয়োজনেও বের হওয়া যায়; যেমন পেশাব-পায়খানার জন্য বের হওয়া, খাদ্য খাবার এনে দেয়ার লোক না থাকলে তা আনার জন্য বের হওয়া, মসজিদের ভেতর অযূর পানির ব্যবস্থা না থাকলে এবং পানি দেওয়ার কেউ না থাকলে উযূর পানির জন্য বাইরে যাওয়া।

২)  যে কাজের জন্য বাইরে যাওয়া হবে সে কাজ সমাপ্ত করার পর সত্বর ফিরে আসবে, বিনা প্রয়োজনে কারও সাথে কথা বলবে না।

৩)  গোসল ফরজ হওয়া ছাড়াও আমরা শরীর ঠান্ডা করার নিয়তে বা শরীর পরিস্কার করার নিয়তে সাধারনত যে গোসল করে থাকি, শুধু এরূপ গোসলেরই উদ্দেশ্যে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। তবে কাউকে বলে যদি পথের মধ্যে পানির ব্যবস্থা করে রাখে বা পুকুর ইত্যাদি থাকে আর পেশাব পায়খানা থেকে ফেরার পথে অতিরিক্ত সময় না লাগিয়ে জলদি ঐ পানি গায়ে, মাথায় ঢেলে বা ডুব দিয়ে গোসল সেরে আসে তাহলে ই‘তিকাফের ¶তি হবেনা।

ই‘তিকাফের অবস্থায় যে সব জিনিস মাকরূহ

১)  ই‘তিকাফ অবস্থায় চুপ থাকলে ছওয়াব হয় এই মনে করে চুপ থাকা মাকরূহে তাহরীমী।

২)  বিনা জরুরতে দুনিয়াবী কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরূহ তাহরীমী। যেমন- ক্রয়-বিক্রয় করা ইত্যাদি। তবে নেহায়েত জরুরত হলে যেমন ঘরে খোরাকী নেই এবং সে ব্যতীত কোন বিশ্বস্তু লোকও নেই -এরূপ অবস্থায় মসজিদে মাল-পত্র উপস্থিত না করে কেনা-বেচার চুক্তি করতে পারে।

ই‘তিকাফের মোস্তাহাব আদবসমূহ

১)  ই‘তিকাফের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ নির্বাচন করবে। সর্বোত্তম মসজিদ হল মসজিদুল হারাম, তারপর মসজিদে নববী, তারপর বাইতুল মুকাদ্দাস, তারপর যে জামে মসজিদে জামা’আতের ব্যবস্থা আছে, তারপর মহল্লাহর মসজিদ, তারপর যে মসজিদে বড় জামা‘আত হয়।

২)  নেক কথা ব্যতীত অন্য কথা না বলা, বেকার বসে না থেকে নফল নামাজ, তিলওয়াত, তাসবীহ্ তাহলীলে মশগুল থাকা উত্তম।

ই‘তিকাফে করণীয়ঃ

  • ই‘তিকাফ নিয়ে হৈ-চৈ ধুমপান আনুষ্ঠানিকতা প্রচার-প্রচারনা সম্পূর্নরূপে পরিহার করুন।
  • ই‘তিকাফে আল্লাহকে নিয়ে বেশি বেশি ভাবুন এবং তাঁকে জানুন। তাঁর প্রশংসা ও গুনগান এবং শুকরিয়া জ্ঞাপন করুন ।
  • গতানুগতিক কুরআন তিলাওয়াত, নামায, তাসবিহ পাঠে সনÍষ্ট না থেকে সবকিছুর গভীরে প্রবেশ করে উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জনে চেষ্টা করুন।
  • অভিজ্ঞ কারো সাথে পরামর্শ করে ভাল পরিকল্পনা ও কর্মসূচী তৈরি করুন।
  • ই‘তিকাফ অবস্থায় অর্থসহ কুরআন পাঠ, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূরা, দুআ তাসবীহ মুখস্থ করা, বিশেষ বিষয়ে গবেষণা পর্যালোচনা, দীর্ঘ সময় ধরে নামাযের অভ্যাস করা, হাদীস গ্রন্থ, মুসলিম মনীষীদের জীবন চরিত অধ্যয়ন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তাসবীহ দূরুদ ইত্যাদি নানা বিষয়ে অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা করুন ।
  • প্রতিদিনের কর্মকান্ড পর্যালোচনা করুন । প্রত্যেক আগামী দিন যেন আগের দিনের চেয়ে উত্তম ও উন্নত হয়।
  • একসঙ্গে বেশ কয়েকজন ই‘তিকাফ করার সময় সাধারণ দুনিয়াবী গল্প বা আড্ডা এবং হাসি ঠাট্টা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করুন। প্রত্যেকেই অন্যকে সহায়তা করুন। ইফতার, সেহরী একত্রে করুন। বেশী বেশী দু’আর এহতেমাম করুন।

উপসংহার আফসোস! মুসলমানদের জনপদের অবস্থা এখন এই যে, আল্লাহর ঘরের দাওয়াত কবুল করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি ভাড়া করে একজন দু’জনকে ই‘তিকাফে বসিয়ে তারা যেন কাঁধের বোঝা নামায়। কারণ তারা শুনছে, কোন বস্তিতে একজনও যদি ই‘তিকাফ না করে তাহলে পুরা বস্তি ই‘তিকাফের সুন্নাতে মুআক্কাদাহ তরক করার গোনাহগার হয়।

চলো হে মুসলিম ভাই, বিশেষ করে হে মসুলিম উম্মাহর তরুনসমাজ, চলো, আমরা নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সুন্নাতটি যিন্দা করে একশ শহীদের সওয়াব লাভ করি। রামাযানের শেষ দশদিন আল্লাহর ঘর যেন এমন ভরে যায় যে, তিলধারনের জায়গা নেই; যেন ইবাদতের উৎসবে মুখরিত এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তারপর দেখো, আল্লাহর প¶ হতে কেমন রহমত আমাদের উপর নাযিল হয়, আমীন।

সংকলনেঃ মাওলানা বিলাল হুসাইনডিওএইচএস বারিধারা, ঢাকা

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *